জিম্মি কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা, ভেঙে পড়ছে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা
শত শত ফাইল নিয়ন্ত্রণ, কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি—নীরব দর্শক কি কর্তৃপক্ষ?
ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট (উত্তর) ঘিরে একটি শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কমিশনার ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) সদস্যদের নাম ভাঙিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এ চক্রটি কর্মকর্তাদের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে অবৈধ ফাইল পাস করানোসহ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানায়, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের আগে ও পরেও একটি সংঘবদ্ধ দালাল গোষ্ঠী নিজেদের ‘উপরমহলের আত্মীয়’ পরিচয় দিয়ে বন্ড কমিশনারেটে প্রভাব বিস্তার করে আসছে। এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা হিসেবে মোস্তফা নামের এক ব্যক্তির নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তিনি নিজেকে কমিশনারের ভাগিনা পরিচয় দিয়ে দাপট দেখান। তার সঙ্গে হেলাল, সফিকসহ আরও ৮–১০ জন সক্রিয় দালাল রয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড অকার্যকর
সূত্রমতে, দালাল মোস্তফা প্রভাব খাটিয়ে বন্ড কমিশনারেটের স্বাভাবিক প্রশাসনিক চেইন অব কমান্ড কার্যত অকার্যকর করে ফেলেছে। কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ, ফাইল আটকে রাখা এবং অবৈধ সুবিধা আদায়ের মাধ্যমে অফিস পরিচালনায় অঘোষিত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এই চক্র।
যেভাবে চলে ভয়ভীতি ও জালিয়াতি
তদন্তে উঠে এসেছে, সিন্ডিকেটটি প্রায় ৩০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের ফাইল সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। কোনো কর্মকর্তা নিয়ম মেনে ফাইলে সই করতে অস্বীকৃতি জানালেই শুরু হয় ভয়ভীতি প্রদর্শন।
সাংবাদিক ও দুদকের ভয়:
অভিযোগ রয়েছে, কথা না মানলে ভাড়াটে সাংবাদিক বা দুদকের পরিচয়ে ফোন করে কর্মকর্তাদের হুমকি দেওয়া হয়। ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও চাপ সৃষ্টি করা হয়।
বিনা অডিটে ফাইল পাসের চাপ:
অনেক ক্ষেত্রে আগেই ‘অডিট সম্পন্ন’ দেখিয়ে কাগুজে ফাইল তৈরি করে রাখা হয়। এরপর কর্মকর্তাদের বাধ্য করা হয় কেবল সই দেওয়ার জন্য।
বদলি–পদায়নের ভয়:
ARO ও RO পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বদলি বা অবাঞ্ছিত স্থানে পদায়নের ভয় দেখিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে ফোন করার অভিযোগও রয়েছে।
ব্যবসায়ী ও মালিকপক্ষ জিম্মি:
একবার কোনো প্রতিষ্ঠান এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হলে, সেই কাজ আর অন্য কেউ নিতে পারে না—এমনকি মালিকপক্ষও জিম্মি হয়ে পড়ে। নির্দেশ না মানলে বন্ড লাইসেন্স বাতিলের ভয় দেখানো হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই সিন্ডিকেটে একবার কোনো প্রতিষ্ঠান ঢুকে পড়লে, সেই কাজ আর অন্য কেউ নিতে পারে না—এমনকি মালিকপক্ষও না।
নির্দেশ অমান্য করলে—
অথচ সিন্ডিকেটের নির্দেশ মেনে চললে নিয়ম ভেঙে হলেও কাজ “সহজেই” হয়ে যায়।
কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকি
জেনারেল বন্ড নবায়ন, অডিট, HS Code সংযোজনসহ বিভিন্ন কাজে লাখ লাখ টাকা ঘুষ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এসব অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা না হয়ে দালালদের পকেটে চলে যাচ্ছে।
নিয়মভঙ্গ করে বন্ডেড পণ্য খোলা বাজারে বিক্রি, কাগুজে অডিট দেখিয়ে ভুয়া রপ্তানি হিসাব তৈরির মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের আর্তনাদ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন,
“এই সিন্ডিকেট প্রায় ৩০০টিরও বেশি প্রতিষ্ঠানের কাজ করে। ফাইলগুলো পূর্ণ তদন্ত করলে তাদের শক্তি প্রয়োগের প্রমাণ মিলবে। আমরা সাধারণ চাকরিজীবী। কথা না মানলে অফিসে নিরাপদে কাজ করতে পারব কি না, সেই শঙ্কা থাকে। তাই বিবেকের বিরুদ্ধে গিয়েও কাজ করতে হয়।”
আরেক কর্মকর্তা বলেন,
“নিয়ম মেনে কাজ করতে চাইলে উপর থেকে ফোন আসে। সাংবাদিক বা দুদক পরিচয়ে এমন ভয় দেখানো হয় যে, একসময় নিজের নিরাপত্তাই বড় হয়ে দাঁড়ায়।”
অন্যদিকে শিল্পমালিকদের অভিযোগ, দালালদের মাধ্যমে না চললে ইচ্ছাকৃতভাবে ত্রুটি খুঁজে ফাইল আটকে রাখা হয়। ফলে ব্যবসায়ীরাও কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন।
দালালমুক্ত বন্ড অফিসের দাবি
সংশ্লিষ্ট মহলের জোরালো দাবি, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের অফিস আদেশ নং–৩৭৭ (তারিখ: ০৬/১১/২০২৫) অনুযায়ী ঢাকা কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট (উত্তর) দালাল চক্রমুক্ত ঘোষণা করতে হবে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মচারী সতর্ক করে বলেন,
“এই পরিবেশে সাধারণ কর্মচারী বা প্রতিষ্ঠান প্রতিনিধি যদি আইন নিজের হাতে নিতে বাধ্য হয়, তার দায় কমিশনারকেই নিতে হবে।”
সব পক্ষের একটাই দাবি—শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে বন্ড অফিস দালালমুক্ত করা এবং সৎ কর্মকর্তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের সবচেয়ে জরুরি প্রয়োজন।