কমমূল্য দেখিয়ে কোটি টাকা পাচার, ব্যবহৃত গাড়ি ‘ব্র্যান্ডনিউ’ দেখিয়ে খালাস—জড়িত একাধিক প্রতিষ্ঠান ও কর্মকর্তা
একটি বিলাসবহুল পোরশে টাইকুন গাড়ি আমদানিকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি, শুল্ক ফাঁকি ও অর্থপাচারের অভিযোগ উঠেছে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের সাবেক ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মীর রাশেদ বিন আমানের বিরুদ্ধে। কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে—গাড়িটি আমদানির প্রতিটি ধাপে পরিকল্পিত অনিয়মের মাধ্যমে প্রায় ২ কোটির বেশি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
[caption id="attachment_10971" align="aligncenter" width="972"]
বিলাসবহুল পোরশে টাইকুন গাড়ি আমদানিকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি, শুল্ক ফাঁকি[/caption]
অনুসন্ধান বলছে, জার্মানিতে তৈরি পোরশে টাইকুন টার্বো এস মডেলের গাড়িটি প্রথমে যুক্তরাজ্যে রপ্তানি হয়ে সেখানে নিবন্ধিত ও ব্যবহৃত হয়। তবে সেই ব্যবহৃত গাড়িকেই বাংলাদেশে ‘ব্র্যান্ডনিউ’ হিসেবে ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা হয়। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো—যুক্তরাজ্যের কাছে এই গাড়ির বাংলাদেশে রপ্তানির কোনো তথ্য নেই, অর্থাৎ রপ্তানি প্রক্রিয়াতেই রয়েছে গুরুতর অসঙ্গতি।
গাড়িটি আমদানি করেছে বিএসএস এন্টারপ্রাইজ, কিন্তু বিক্রি করেছে কারীব অটোস লিমিটেড। অথচ বিআরটিএ-তে নিবন্ধনে ক্রেতা হিসেবে দেখানো হয়েছে ভিন্ন তথ্য। আমদানির ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্যের ইএমসিসি সল্যুয়েশন লিমিটেড নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে গাড়িটি আনা হয়, যা কোনো অনুমোদিত পোরশে ডিলার বা বিলাসবহুল গাড়ির রপ্তানিকারক নয়; বরং মূলত ট্রাক রপ্তানিকারক একটি ব্রোকার প্রতিষ্ঠান।
মূল্য জালিয়াতির মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকির বিষয়টিও স্পষ্ট হয়েছে অনুসন্ধানে। যেখানে গাড়িটির প্রকৃত মূল্য প্রায় ১ লাখ ৬১ হাজার পাউন্ড, সেখানে আমদানির সময় দেখানো হয়েছে মাত্র ৫০ হাজার পাউন্ড। ফলে প্রায় ১ কোটি ৫৩ লাখ টাকা শুল্ককর প্রযোজ্য হলেও আদায় করা হয়েছে মাত্র ৬৭ লাখ টাকা। এতে প্রায় ২ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি দেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
[caption id="attachment_10972" align="alignnone" width="970"]
বিলাসবহুল পোরশে টাইকুন গাড়ি আমদানিকে ঘিরে চাঞ্চল্যকর জালিয়াতি, শুল্ক ফাঁকি[/caption]
একইসঙ্গে, আন্ডার-ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে প্রায় ২ কোটি ১২ লাখ টাকার বেশি বিদেশে পাচার করা হয়েছে। পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল সুপরিকল্পিত—ব্রোকার প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমদানি, ভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে নিবন্ধন, কমমূল্য দেখানো এবং ব্যবহৃত গাড়িকে নতুন হিসেবে ঘোষণা।
এই ঘটনায় কাস্টমস গোয়েন্দা ২০২৫ সালের ২৪ মে অনুসন্ধান প্রতিবেদন জমা দেয় এবং চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি মানিলন্ডারিং আইনে মামলা দায়ের করে। মামলায় মীর রাশেদ বিন আমানসহ আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিএসএস এন্টারপ্রাইজের মালিক, কারীব অটোসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, চেয়ারম্যান ও পরিচালককে আসামি করা হয়েছে।
তবে শুল্কায়ন প্রক্রিয়ায় জড়িত চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের একাধিক কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা থাকলেও তাদের বিরুদ্ধে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। যদিও এনবিআরের নির্দেশনা উপেক্ষা করে কমমূল্যে শুল্কায়ন করার বিষয়টি তদন্তে উঠে এসেছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, মীর রাশেদ বিন আমান সোনালী লাইফ ও ব্যাংক খাত থেকে প্রায় ৪৭ কোটি টাকার বেশি আত্মসাৎ ও পাচারের সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় পালিয়ে গেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ বিষয়ে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান বিএসএস এন্টারপ্রাইজ দাবি করেছে, দরকষাকষির মাধ্যমে কমমূল্যে গাড়িটি কেনা হয়েছে এবং এতে কোনো অনিয়ম হয়নি। অন্যদিকে কারীব অটোস জানিয়েছে, তারা কেবল বিক্রয়কারী হিসেবে কমিশন নিয়েছে।
কাস্টমস গোয়েন্দার মহাপরিচালক নেয়াজুর রহমান জানিয়েছেন, পুরো ঘটনায় মানিলন্ডারিং আইনে মামলা করা হয়েছে এবং শুল্কায়নের অনিয়ম খতিয়ে দেখতে এনবিআরকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই ঘটনায় শুল্ক ফাঁকি, অর্থপাচার ও প্রশাসনিক গাফিলতির একটি বড় চিত্র সামনে এসেছে, যা দেশের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ও আমদানি নিয়ন্ত্রণে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে।