সর্বশেষ
আওয়ামী আমলের বিসিএস নিয়োগে দুর্নীতির অভিযোগে তদন্ত শুরু
অডিও ফাঁসে বিপাকে পুলিশ কর্মকর্তা: অপহরণ–মুক্তিপণ কাণ্ডে বরখাস্তের সুপারিশ
ডিপিডিসিতে প্রশাসনিক অস্থিরতা: শূন্য পদ, বিতর্কিত নিয়োগ ও সিন্ডিকেটের অভিযোগে সংকট গভীরতর
আসিফ নজরুলকে ৩ কোটি টাকা দিয়ে বদলি! মাত্র এক বছরে ২০ কোটি টাকার সম্পদ গড়ার অভিযোগ সাভারের সাব-রেজিস্ট্রার জাকিরের বিরুদ্ধে।
ময়মনসিংহ বন বিভাগে ডেপুটি রেঞ্জার ইসমাইলের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুতর অভিযোগ
কমলাপুর আইসিডিতে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ—নেতৃত্বে গোলাম কিবরিয়া ও তৌহিদুর রহমান লিমন।
জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় থমকে যশোর-ঝিনাইদহ ছয় লেন প্রকল্প, ছয় বছরে অগ্রগতি মাত্র ৫%
গ্রামীণ গ্রুপের কর অব্যাহতি ও মওকুফে বিতর্ক: দেড় বছরে হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঝুঁকিতে
পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান বেলায়েত ও পরিবারের আয়কর নথি চাইল আদালত
দুর্নীতির মামলায় গাজীপুর সিটির বরখাস্ত প্রকৌশলী ইব্রাহিম খলিল কারাগারে
দেশজুড়ে চাঁদাবাজদের নিরপেক্ষ তালিকা করছে র‍্যাব, দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা
রফতানিতে ধস, আমদানিতে চাপ: বাড়ছে বাণিজ্য ঘাটতি, স্বস্তি দিচ্ছে রেমিট্যান্স
রিজার্ভে ইতিবাচক ধারা অব্যাহত, গ্রস ৩৪.৬৫ বিলিয়ন ডলার
কলমের খোঁচায় কোটি টাকার কর কমানো: চসিকে দুই কর্মকর্তার কারসাজিতে ১০ কোটির বেশি রাজস্ব ক্ষতি
ইন্দোনেশিয়া থেকে কয়লা আমদানির নামে ১০ কোটি টাকা আত্মসাৎ, কারাগারে ফারজানা ইয়াসমিন নিলা

দৈনিক হাজিরার নকলনবিশ, তবু কোটি টাকার সম্পদ: কালীগঞ্জ সাবরেজিস্ট্রি অফিসে আল-আমিনের রহস্যময় উত্থান

বিশেষ প্রতিনিধি

প্রতি পৃষ্ঠা দলিল নকল করার জন্য পান মাত্র ৩৬ টাকা। কাজ করেন দৈনিক হাজিরাভিত্তিক মাস্টাররোল কর্মচারী হিসেবে। অথচ তার নামে-বেনামে গড়ে উঠেছে বিপুল সম্পদের পাহাড়। আল-আমিন খান নামের এই ব্যক্তি গাজীপুরের কালীগঞ্জ সাবরেজিস্ট্রি অফিসের একজন নকলনবিশ।

জমি কেনাবেচার দলিল, ব্যাংক হিসাব ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আয়কর রিটার্নে তার ঘোষিত আয় ও বাস্তব সম্পদের মধ্যে বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে।

২০২১–২০২২ অর্থবছরের আয়কর রিটার্নে আল-আমিন খান নিজের পেশা উল্লেখ করেছেন চাকরি। সেখানে দেখানো হয়েছে, বছরে তার মূল বেতন ২ লাখ ৪৯ হাজার ৫০০ টাকা। বাড়িভাড়া বাবদ আয় ১ লাখ ২৪ হাজার ৭০০ টাকা। চিকিৎসা ভাতা ১৪ হাজার ৯০০ টাকা, যাতায়াত ভাতা সাড়ে ১৪ হাজার টাকা এবং বোনাস ৪১ হাজার ৫০০ টাকা। সব মিলিয়ে বেতন খাতে বছরে প্রায় সাড়ে ৪ লাখ টাকা আয় দেখানো হয়েছে। এর বাইরে ব্যবসা থেকে আয় দেখানো হয়েছে ৩ লাখ ১৩ হাজার টাকা।

রিটার্নে তার স্থাবর সম্পদের মধ্যে একটি বাড়ির মূল্য দেখানো হয়েছে ৪৩ লাখ ১০ হাজার টাকা। এছাড়া আসবাবপত্র ৫০ হাজার টাকা এবং ইলেকট্রনিক পণ্য ৮০ হাজার টাকার উল্লেখ রয়েছে। কৃষিজমি বা গাড়ির তথ্য নেই। নগদ ছিল ৭ হাজার ৫০০ টাকা এবং ব্যাংকে জমা ছিল ৩৯ হাজার ৫০০ টাকা।

তবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। আয়কর নথিতে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তব সম্পদের বড় ধরনের গরমিল রয়েছে। ঘোষিত আয়ের তুলনায় তার জমি ক্রয়, ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা এবং অন্যান্য সম্পদের পরিমাণ অস্বাভাবিক বেশি।

কালীগঞ্জ উপজেলা সাবরেজিস্ট্রার জাহিদুর রহমান বলেন, আল-আমিন আয়কর রিটার্নে কী উল্লেখ করেছেন তা তার জানা নেই। তবে তিনি কোনো স্থায়ী চাকরিজীবী নন। নকলনবিশরা মাস্টাররোল কর্মচারী হিসেবে কাজ করেন। রেজিস্ট্রিকৃত দলিল বালাম বইয়ে লিপিবদ্ধ করা ও দলিল নকল করার জন্য প্রতি পৃষ্ঠায় ৩৬ টাকা ফি পান।

তিনি জানান, ২০২১-২২ সালে আল-আমিন নকল লেখা বাবদ সম্মানী পেয়েছেন ১৩ হাজার ১০৪ টাকা। ২০১৯ সালে পেয়েছেন ৪৮ হাজার ১১৬ টাকা, ২০২০ সালে ৬৯ হাজার ৪৩২ টাকা এবং ২০২৪ সালে ৩৯ হাজার ২৪০ টাকা। ২০২৩ সালে কাজ না করায় তিনি কোনো সম্মানী পাননি।

পারিবারিক সূত্রে সাবরেজিস্ট্রি অফিসে

কালীগঞ্জ পৌর এলাকার মৃত কফিল উদ্দিন খানের ছেলে আল-আমিন খান। পারিবারিক সূত্রেই তিনি সাবরেজিস্ট্রি অফিসের সঙ্গে যুক্ত হন। তার ফুপু মিনারা বেগম ওই অফিসের অফিস সহকারী ছিলেন। তার মাধ্যমেই ১৯৯৬ সালে মাস্টাররোল কর্মচারী হিসেবে নকলনবিশ পদে কাজ শুরু করেন আল-আমিন।

২০০৯ সালে তার বড় বোন রায়হানা বেগম ওই অফিসে প্রথমে মোহরার এবং পরে অফিস সহকারী পদে যোগ দেন। স্থানীয়দের দাবি, এরপর থেকেই সাবরেজিস্ট্রি অফিসে আল-আমিনের প্রভাব বাড়তে থাকে।

সাত দলিলে আড়াই কোটি টাকার জমি

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১৪ সালের জুন থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত সাতটি দলিলে প্রায় ২ কোটি ৪৬ লাখ ৫ হাজার টাকার জমি কিনেছেন আল-আমিন খান। এসব জমি কেনা হয়েছে তার ছোট ভাই রুহুল আমিনের সঙ্গে যৌথ মালিকানায়। মোট জমির পরিমাণ ২২৩ দশমিক ৫৯৫ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় পৌনে সাত বিঘা।

দলিল পর্যালোচনায় দেখা গেছে, সাতটির মধ্যে পাঁচটি দলিলে জমির মূল্য সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে কম দেখানো হয়েছে। এতে রেজিস্ট্রেশন ফি, স্ট্যাম্প ডিউটি, স্থানীয় সরকার কর, উৎস কর ও ভ্যাট বাবদ ১১ লাখ টাকার বেশি রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ রয়েছে।

২০১৪ সালের ৬ আগস্ট উপজেলার বোয়ালী মৌজার ২০৪ ও ৪০৫ দাগে ৩৫ শতাংশ জমি কেনেন আল-আমিন ও তার ভাই রুহুল আমিন। দলিলে ‘বর্ষা’ শ্রেণির ওই জমির মূল্য দেখানো হয়েছে ১১ লাখ ১০ হাজার টাকা। অথচ ওই বছর একই শ্রেণির জমির প্রতি শতাংশের সরকারি মূল্য ছিল ১ লাখ ৩৪ হাজার ২৮৪ টাকা। সেই হিসাবে জমিটির প্রকৃত মূল্য প্রায় ৪৬ লাখ ৯৯ হাজার ৯৪০ টাকা হওয়ার কথা ছিল। এতে ওই দলিলেই প্রায় ৪ লাখ ৪৮ হাজার টাকা রাজস্ব ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে।

এছাড়া ২০১৫ সালের একটি দলিলে ৪৯ হাজার ৮৫০ টাকা, ২০১৬ সালের একটি দলিলে ৯১ হাজার ১৫৮ টাকা, ২০২২ সালের একটি দলিলে ৩ লাখ ৪ হাজার টাকা এবং ২০২৩ সালের একটি দলিলে ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা রাজস্ব ফাঁকির তথ্য পাওয়া গেছে।

এখনও নিজের নামে বিপুল জমি

সম্প্রতি কয়েকটি জমি বিক্রি করলেও বর্তমানে আল-আমিনের নিজের নামে রয়েছে ১৮৩ দশমিক ০৭ শতাংশ জমি। স্থানীয়দের মতে, এসব জমির বাজারমূল্য প্রায় দেড় কোটি টাকার বেশি।

কালীগঞ্জ উপজেলার বোয়ালী-২৯ মৌজার বিভিন্ন দাগে ৭০ শতাংশ, ৪১৭, ৪৭১ ও ৫৭২ দাগে ৪৫ শতাংশ, ৭৫ দাগে ১৭ দশমিক ২৫ শতাংশ এবং ৪৭৮, ৫৬৫, ৫৬৭, ৫৮৭ ও ৬২৯ দাগে ১৪ দশমিক ৮২ শতাংশ জমি রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণ ভাদার্ত্তী মৌজায় ২০১ দাগে ২৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ১৬৮ দাগে ১১ দশমিক ৫ শতাংশ জমি রয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, রাজধানীর পূর্বাচলেও তার নামে-বেনামে একাধিক প্লট রয়েছে। তবে আয়কর নথিতে এমন কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

ব্যাংক হিসাবে লেনদেন

অনুসন্ধানে আল-আমিন খানের ব্যাংক হিসাবের তথ্যও পাওয়া গেছে। তার নামে পাঁচটি ব্যাংকে পাঁচটি হিসাব রয়েছে। গত ১৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এসব হিসাবে মোট জমা রয়েছে ২৫ লাখ ৪১ হাজার ৪৮৮ টাকা।

এর মধ্যে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকে রয়েছে ৯ লাখ ৩৭ হাজার ৩১০ টাকা, পূবালী ব্যাংকে ১৪ লাখ ৬৩ হাজার ৩১৯ টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে ১ লাখ ১৪ হাজার ৮৬৩ টাকা এবং ডাচ-বাংলা ব্যাংকে ২৫ হাজার ৯৯৬ টাকা। এক্সিম ব্যাংকের হিসাবে কোনো টাকা নেই।

সিন্ডিকেটের অভিযোগ

সাবরেজিস্ট্রি অফিসের একাধিক নকলনবিশ জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে অফিসটিতে প্রভাব বিস্তার করে আসছিলেন আল-আমিন। জমি ক্রেতা-বিক্রেতা ও দলিল লেখকদের কাছ থেকে বিভিন্নভাবে টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দলিল লেখক বলেন, ২০০৮ সালের শেষ দিকে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর আল-আমিন সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির এপিএস সেলিম এবং উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুল গণি ভূঁইয়ার সঙ্গে সখ্যতা গড়ে তোলেন। এরপর তিনি হয়ে ওঠেন ওই অফিসের অলিখিত প্রভাবশালী ব্যক্তি।

ওই দলিল লেখক জানান, একসময় টিনের ঘরে বসবাস করা আল-আমিন পরে সেটি ভেঙে কয়েক কোটি টাকায় বিলাসবহুল তিনতলা বাড়ি নির্মাণ করেন। বাড়ির অনেক ফিটিংস বিদেশ থেকে আনা হয়েছে বলেও স্থানীয়দের দাবি। বাসা থেকে অফিসের দূরত্ব এক কিলোমিটারের কম হলেও তিনি ৬০ লাখ টাকা মূল্যের একটি প্রাইভেট কারে যাতায়াত করতেন।

বদলি হলেও অফিসে অনুপস্থিত

সাবরেজিস্ট্রি অফিসের এক কর্মচারীকে মারধরের অভিযোগে আল-আমিনের বিরুদ্ধে কালীগঞ্জ থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা হয়। ওই ঘটনার পর গত মে মাসে তাকে কালিয়াকৈর সাবরেজিস্ট্রি অফিসে বদলি করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দাবি, বদলি হলেও তিনি সেখানে নিয়মিত অফিস করেন না।

কালিয়াকৈর সাবরেজিস্ট্রার অফিসের কর্মচারী ফরিদা বলেন, তিনি এই অফিসে যোগ দেওয়ার পর থেকে আল-আমিনকে কখনো অফিসে আসতে দেখেননি।

অভিযোগ অস্বীকার

রাজস্ব ফাঁকি, আয়কর নথিতে তথ্য গোপনসহ বিভিন্ন অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে আল-আমিন খান বলেন, “মানুষ অনেক ধরনের শত্রুতা করে। হয়তো আমার বিরুদ্ধেও কেউ শত্রুতা করে এসব করছে। আপনারা তদন্ত করে বের করেন। আমি কোনো দুর্নীতি করিনি।”

কালিয়াকৈর অফিসে যোগ দেওয়ার পরও কেন সেখানে নিয়মিত যাচ্ছেন না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

প্রশাসনের বক্তব্য

গাজীপুর জেলা রেজিস্ট্রার মো. মিজানুর রহমান বলেন, “যার বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি আমার অফিসের স্থায়ী সদস্য নন। তার কাজ চুক্তিভিত্তিক। তার বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পাইনি। তবে মৌখিকভাবে এবং পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ দেখে তাকে বদলি করা হয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, প্রমাণসহ লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সম্পর্কিত খবর

এই পাতার আরও খবর

সর্বশেষ