
কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট (উত্তর) ঘিরে দুর্নীতির জাল
কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট (উত্তর) ঘিরে এক রাজস্ব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অসাধু ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগসাজশে ব্যাপক দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য ও অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দেশের বিভিন্ন ভ্যাট সার্কেল অফিস, সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এবং ছোট-বড় উৎপাদন কারখানায় নিয়মিত অভিযান ও পরিদর্শনের নামে চলছে অনৈতিক লেনদেনের মহোৎসব।
অভিযোগ অনুযায়ী, কিছু রাজস্ব কর্মকর্তার ব্যক্তিগত লোভ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে ভ্যাট সার্কেল অফিসগুলো কার্যত দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। সরকারের রাজস্ব সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারাই অসাধু ব্যবসায়ীদের সুবিধা দিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন।
শুল্কায়ন থেকে লাইসেন্স—প্রতিটি ধাপে অনিয়ম
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট বিভাগে ধাপে ধাপে অনিয়ম হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। শুল্কায়ন প্রক্রিয়া, ভ্যাট নির্ধারণ, নথিপত্র অনুমোদন ও ব্যবসায়িক লাইসেন্স প্রদান—প্রায় প্রতিটি স্তরেই দুর্নীতি ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সূত্র জানায়, এসব অবৈধ লেনদেনে কেবল কর্মকর্তা-কর্মচারীরাই নন, বহিরাগত দালালচক্রও সক্রিয়ভাবে মুখ্য সহায়তাকারীর ভূমিকা পালন করছে।
তরিকুল ইসলাম—অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে
এই দুর্নীতিচক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে উঠে এসেছে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট (উত্তর)-এ কর্মরত রাজস্ব কর্মকর্তা তরিকুল ইসলামের নাম। চুয়াডাঙ্গার জীবননগরের মকসেদ আলীর ছেলে তরিকুল ইসলামের জীবনধারায় চাকরিতে যোগদানের পর “জাদুর মতো পরিবর্তন” এসেছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়।
সম্প্রতি তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ফাইল বাণিজ্য ও ঘুষ গ্রহণসহ নানাবিধ দুর্নীতির অভিযোগ তুলে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে।
ঘুষের বিনিময়ে অনুমোদন, রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তা
দুদকে দাখিলকৃত অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ভ্যাট সংক্রান্ত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র অনুমোদন এবং ব্যবসায়িক লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের ঘুষ গ্রহণ করেছেন তরিকুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, তিনি বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠানকে অনৈতিক সুবিধা দিয়ে রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তা করেছেন, যার ফলে সরকার কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে।
এছাড়া দপ্তরে প্রভাব খাটিয়ে পছন্দের ও সুবিধাজনক স্থানে একাধিকবার পোস্টিং নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে তার বিরুদ্ধে ওঠা নানা অভিযোগ সহজেই ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
অবৈধ সম্পদের পাহাড়, বেনামে জমি–ফ্ল্যাটের অভিযোগ
অভিযোগে আরও বলা হয়, তরিকুল ইসলাম তার বৈধ আয়ের উৎসের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল পরিমাণ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পদের মালিক হয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে বেনামে কেনা জমি, ফ্ল্যাট এবং একাধিক ব্যাংক অ্যাকাউন্ট। ঢাকা কাস্টমস হাউসে কর্মরত থাকাকালে রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
সংস্থার ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন, তদন্তের দাবি
রাজস্ব বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের গুরুতর অভিযোগ প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। কাস্টমস এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেটের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অবিলম্বে নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন।
তাদের ভাষ্য, অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ রাজস্ব বিভাগের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানে থেকে এমন অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়াতে সাহস না পায়।





