
বন্ড সুবিধার আড়ালে শুল্ক লুট: পাঁচ বছরে ২৭ হাজার টন কাপড় বিক্রি, ৮৯৯ কোটি টাকার জালিয়াতির অভিযোগ
কারখানা সক্ষমতা নেই, তবু হাজার হাজার টন কাপড় আমদানি: বন্ড জালিয়াতিতে প্রোস্টার অ্যাপারেলস
ন্ডের নামে লুটপাট: প্রোস্টার অ্যাপারেলসের বিরুদ্ধে শত শত কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকির অভিযোগ
কাপড় আমদানিতে অস্বাভাবিকতা, রপ্তানিতে জালিয়াতি: বন্ড অপব্যবহারে প্রোস্টার অ্যাপারেলস
বন্ড সুবিধার অপব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ শুল্কমুক্ত কাপড় খোলাবাজারে বিক্রি এবং ভুয়া রপ্তানি দেখিয়ে শত শত কোটি টাকা শুল্ক ও ভ্যাট ফাঁকির অভিযোগ উঠেছে গাজীপুরের শ্রীপুরে অবস্থিত তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান প্রোস্টার অ্যাপারেলস লিমিটেড-এর বিরুদ্ধে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, গত পাঁচ বছরে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ২৭ হাজার ৩৭৯ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি করেছে, যার বিপরীতে তাদের প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা নেই।
উৎপাদন সক্ষমতার বহু গুণ বেশি আমদানি
২০২১ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্ড সুবিধায় প্রতিষ্ঠানটি মোট ২ কোটি ৭৩ লাখ ৭৯ হাজার ৪৩৬ কেজি বা ২৭ হাজার ৩৭৯ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি করেছে। গড়ে প্রতিবছর প্রায় ৫ হাজার ৪৭৬ মেট্রিক টন এবং প্রতিমাসে ৪৫৬–৪৫৭ মেট্রিক টন কাপড় আমদানি করা হয়েছে।
কিন্তু বন্ড লাইসেন্স অনুযায়ী প্রোস্টার অ্যাপারেলসের কারখানায় এত বিপুল পরিমাণ কাপড় ব্যবহার করে পোশাক তৈরির সক্ষমতা নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, শুধুমাত্র ইউডির (ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশন) ভিত্তিতে রপ্তানি সক্ষমতার কয়েকগুণ বেশি কাপড় আমদানি করা হয়েছে, যার বড় অংশ খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে।
ডোর–টু–ডোর সার্ভিসে কাপড় বিক্রির অভিযোগ
আমদানি তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি কুরিয়ার সার্ভিস ব্যবহার করে সর্বনিম্ন ১ কেজি থেকে ২০ কেজি পর্যন্ত কাপড় আমদানি করেছে। সূত্র বলছে, এসব কাপড় মূলত ডোর–টু–ডোর সার্ভিসে বিক্রির উদ্দেশ্যেই আনা হয়েছে। শুধু তাই নয়, এলসি কন্ট্রাক্ট ও এফওসি (ফ্রি অব কস্ট) সুবিধায় কনটেইনার ভর্তি কাপড় আমদানি করে সেগুলোও বাজারে বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে।
পাঁচ বছরে প্রায় ৮৯৯ কোটি টাকার শুল্ক ফাঁকি
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পাঁচ বছরে আমদানি করা এই বিপুল পরিমাণ কাপড়ের বিপরীতে প্রযোজ্য শুল্ক ও ভ্যাটের পরিমাণ প্রায় ৮৯৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে—
- ২০২১–২০২২ দুই বছরে আমদানি করা ৯ হাজার ২৫৫ মেট্রিক টন কাপড় ও এক্সেসরিজে শুল্ককর প্রায় ২৫৪ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
- ২০২৩–২০২৫ তিন বছরে আমদানি করা ১৮ হাজার ১২৪ মেট্রিক টন কাপড় ও এক্সেসরিজে শুল্ককর প্রায় ৬৪৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা।
বেশিরভাগ কাপড় এফওসি সুবিধায় আমদানি হওয়ায় সেগুলো সহজেই খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বন্ড অভিযানে ২৭৬ মেট্রিক টন কাপড় বিক্রির প্রমাণ
গোপন তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১৯ আগস্ট ঢাকা উত্তর কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট প্রোস্টার অ্যাপারেলসে অভিযান চালায়। অভিযানে দেখা যায়, ২১টি বিল অব এন্ট্রির মাধ্যমে খালাস করা ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৭২৭ কেজি কাপড়ের মধ্যে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৭৫৫ কেজি (প্রায় ২৭৬–২৭৭ মেট্রিক টন) কাপড় বন্ডেড ওয়্যারহাউসে নেই।
বন্ড কর্মকর্তারা নিশ্চিত হয়েছেন, এই কাপড় সরাসরি খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়েছে। এতে প্রযোজ্য শুল্ক ও ভ্যাট ফাঁকির পরিমাণ ১১ কোটি ৭২ লাখ ৪৭ হাজার ২৮৪ টাকা। এ ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে কারণ দর্শানো নোটিশ জারি করা হয়েছে।
ভুয়া রপ্তানি ও এইচএস কোড জালিয়াতি
শুধু আমদানি নয়, রপ্তানিতেও ব্যাপক অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়—
- আমদানি করা কাপড়ের সঙ্গে রপ্তানিতে দেখানো কাপড়ের কোনো মিল নেই।
- ‘ওভেন জ্যাকেট’, ‘লেডিস নিট জ্যাকেট’-এর মতো অস্তিত্বহীন পণ্যের নাম ব্যবহার করে রপ্তানি দেখানো হয়েছে।
- কম্বলের কাপড় আমদানি করে বাজারে বিক্রি করে দিয়ে নিট পোশাক হিসেবে ভুয়া রপ্তানি দেখানো হয়েছে।
- অন্য প্রতিষ্ঠানের স্টক লট পণ্য নিজের নামে দেখিয়ে কোটি কোটি টাকার ভুয়া রপ্তানি করা হয়েছে।
২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি মোট ২০ হাজার ৮৭০ মেট্রিক টন পোশাক রপ্তানির তথ্য দেখিয়েছে, যার বড় অংশই ভুয়া বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি।
কাস্টমস ও অফডকের অসাধু চক্র
এনবিআর সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস থেকে সিঅ্যান্ডএফের মাধ্যমে ঘুষের বিনিময়ে কাপড় খালাস করা হয়, যা কারখানায় না গিয়ে সরাসরি ইসলামপুরসহ বিভিন্ন বাজারে চলে যায়। এই জালিয়াতির সঙ্গে অফডক ও কাস্টমসের এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা জড়িত বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিজিএমইএ যাচাইয়ের ঘাটতি
বন্ড কর্মকর্তাদের মতে, বিজিএমইএ যদি ইউপি (ইউটিলাইজেশন পারমিট) দেওয়ার সময় প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা যাচাই করত, তাহলে এ ধরনের শুল্ক ফাঁকি ও জালিয়াতি অনেকাংশে রোধ করা যেত।
প্রতিষ্ঠানপক্ষের বক্তব্য পাওয়া যায়নি
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রোস্টার অ্যাপারেলস লিমিটেডের চেয়ারম্যান জিম সান ইউ জিমি-র ব্যক্তিগত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।





