
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন, রাজনৈতিক প্রতিকূলতা এবং একের পর এক মামলার চাপ পেরিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তন এবং রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে অধিষ্ঠান দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। তার এই উত্থান শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং বাংলাদেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের মাধ্যমে বিএনপি সরকার গঠন করে। এরপর ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তারেক রহমান। জনগণের বিপুল ম্যান্ডেট নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুদায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে তার রাজনৈতিক যাত্রা নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে।
দীর্ঘ প্রবাসজীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম
২০০৭ সালের ‘ওয়ান–ইলেভেন’ পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং পরে চিকিৎসার জন্য ২০০৮ সালে লন্ডনে যাত্রার মধ্য দিয়ে শুরু হয় তারেক রহমানের দীর্ঘ প্রবাসজীবন। তবে দূরত্ব তার রাজনৈতিক কার্যক্রমকে থামাতে পারেনি।
২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দি হলে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন এবং ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সংগঠনকে পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
দীর্ঘদিনের আন্দোলন–সংগ্রাম, ছাত্র আন্দোলন এবং সরকারবিরোধী গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ‘জুলাই বিপ্লব’ দেশের রাজনৈতিক মোড় ঘুরিয়ে দেয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
প্রত্যাবর্তন ও শোকের ছায়া
দীর্ঘ ৬ হাজার ৩১৪ দিনের প্রবাসজীবন শেষে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন তারেক রহমান। রাজধানীর কুড়িলে তাকে গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়, যেখানে লাখো মানুষের উপস্থিতি তার জনপ্রিয়তার প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়।
তবে এই আনন্দঘন মুহূর্তের পাঁচ দিনের মাথায় ৩০ ডিসেম্বর মারা যান তার মা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। ব্যক্তিগত এই শোকের মধ্যেও তিনি দলীয় ঐক্য সুসংহত করতে কাজ চালিয়ে যান এবং ৯ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
নির্বাচনে অভাবনীয় বিজয়
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২৯৭টি আসনের মধ্যে ২১২টিতে জয়লাভ করে সরকার গঠন করে। ঢাকা ও বগুড়ার দুটি আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তারেক রহমান।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাংগঠনিক পুনরুত্থান, জনমনে আবেগ এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা—এই তিনের সমন্বয়েই এই ফলাফল এসেছে।
নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত
নির্বাচনে জয়লাভের পর বিজয় মিছিল না করে দোয়া ও শুকরিয়া আদায়ের নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাশাপাশি রাজনৈতিক সহনশীলতার বার্তা দিয়ে প্রতিপক্ষ নেতাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন তিনি।
প্রথম সংবাদ সম্মেলনেই তিনি বলেন, “বিরোধ যেন প্রতিশোধে পরিণত না হয়।” এই অবস্থানকে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নতুন ধারার সূচনা হিসেবে দেখছেন অনেকে।
জনবান্ধব উদ্যোগ ও আধুনিক নেতৃত্ব
সরকার গঠনের এক মাসের মধ্যেই ‘ফ্যামিলি কার্ড’, শিক্ষা ঋণ এবং ‘স্মার্ট এগ্রিকালচার’সহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। প্রশাসনিক শৃঙ্খলা জোরদার এবং কাজের গতি বাড়াতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর উন্নয়ন ও তরুণদের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তরের মাধ্যমে একটি ভবিষ্যতমুখী রাষ্ট্র গঠনের ইঙ্গিত দিচ্ছে এই সরকার।
সামনে বড় চ্যালেঞ্জ
তবে নতুন সরকারের সামনে রয়েছে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জও। অর্থনৈতিক চাপ, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগে আস্থার সংকট এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ—সবই এখন সরকারের অগ্রাধিকার।
আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক ভারসাম্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু
বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “তারেক রহমান এখন কোটি মানুষের প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু। দুর্নীতিমুক্ত ও অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী বাংলাদেশ গড়াই আমাদের লক্ষ্য।”
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর গোলাম হাফিজ মনে করেন, ব্যতিক্রমধর্মী নেতৃত্বের মাধ্যমে তিনি ইতোমধ্যে মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন। এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশের রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন আসতে পারে।
সব মিলিয়ে, নির্বাসন থেকে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে উঠে আসা তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের রাজনীতির সবচেয়ে আলোচিত নাম। তার নেতৃত্বে দেশ কোন পথে এগোবে—সেদিকেই তাকিয়ে আছে পুরো জাতি।






