
রাজস্ব খাত সংস্কারের গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে প্রণীত রাজস্ব নীতি বিভাগ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ ২০২৫ এখন অনিশ্চয়তার মুখে। অর্থনীতিবিদ ও খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, অধ্যাদেশটি বাতিল হলে রাজস্ব ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত উন্নতি ব্যাহত হবে। অন্যদিকে, এনবিআরের কর্মকর্তা–কর্মচারীদের একটি অংশ এটিকে ত্রুটিপূর্ণ আখ্যা দিয়ে বাতিলের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফলে অধ্যাদেশটি নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে স্পষ্ট বিভাজন তৈরি হয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি হওয়া এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বিলুপ্ত করে রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা—এই দুটি পৃথক বিভাগ গঠনের প্রস্তাব করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও উন্নয়ন সহযোগীদের পক্ষ থেকে রাজস্ব খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়াতে এমন বিভাজনের দাবি জানানো হচ্ছিল। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও এ ধরনের কাঠামোর পক্ষে যুক্তি দেয়।
তবে সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, অধ্যাদেশটি সংসদে পাস না হলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তা বাতিল হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ইতোমধ্যে সংসদীয় বিশেষ কমিটি এটিকে আরও যাচাই–বাছাই করে শক্তিশালী আকারে ভবিষ্যতে উপস্থাপনের সুপারিশ করেছে। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন উদ্যোগ না নিলে অধ্যাদেশটি কার্যত বাতিল হয়ে যেতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজের মতে, এই অধ্যাদেশ রাজস্ব খাতের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তার ভাষায়, “নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন একই প্রতিষ্ঠানের অধীনে থাকলে স্বচ্ছতা ক্ষুণ্ন হয় এবং রাজস্ব আদায়ে বিঘ্ন ঘটে।” তিনি মনে করেন, কিছু সংশোধন সাপেক্ষে হলেও অধ্যাদেশটি সংসদে উপস্থাপন করা সরকারের জন্য ইতিবাচক হবে, কারণ বাজেট বাস্তবায়নে রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির বিকল্প নেই।
এনবিআর সংস্কার পরামর্শক কমিটির সদস্য মো. ফরিদ উদ্দিনও একই সুরে বলেন, অধ্যাদেশ বাতিল হলে ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারিতা বাড়তে পারে। তার মতে, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পৃথক না হলে জবাবদিহি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে তিনি উল্লেখ করেন, পূর্বের সংস্কার সুপারিশগুলো অধ্যাদেশে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি, যা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে।
অন্যদিকে, এনবিআরের ভেতরে আন্দোলনে অংশ নেওয়া কিছু কর্মকর্তা অধ্যাদেশটিকে অবাস্তব ও অযৌক্তিক হিসেবে দেখছেন। তাদের অভিযোগ, এতে এমন বিধান রাখা হয়েছিল যাতে শুল্ক–কর বিষয়ে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা না থাকা ব্যক্তিরাও গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ পেতে পারেন। তাদের মতে, সংসদীয় কমিটির সুপারিশ এই আন্দোলনের যৌক্তিকতাকেই প্রমাণ করে।
সব মিলিয়ে, অধ্যাদেশটি নিয়ে মতবিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কাঠামোগত সংস্কার বনাম বাস্তবায়নযোগ্যতা। একদিকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার যুক্তি, অন্যদিকে প্রশাসনিক দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ—এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই এখন নীতিনির্ধারকদের বড় চ্যালেঞ্জ।
পর্যবেক্ষকদের মতে, অধ্যাদেশটি হুবহু পাস বা পুরোপুরি বাতিল—দুইয়ের কোনোটি নয়, বরং অংশীজনদের মতামত নিয়ে সংশোধিত ও শক্তিশালী রূপে সংসদে উপস্থাপনই হতে পারে কার্যকর সমাধান। এতে রাজস্ব খাতে কাঙ্ক্ষিত সংস্কারও এগোবে, আবার সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর উদ্বেগও কিছুটা প্রশমিত হবে।







